পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনা আমাদের শরীর মন এবং চরিত্রকে উন্নত করে। ইতোমধ্যে ১৮ টি রমজান চলে গেছে। রমজানের তিনটি স্তরের দুটি স্তর আমরা প্রায় অতিক্রান্ত করতে চলেছি। আগামীকাল ২০ রমজান। রহমত এবং মাগফেরাত চলে যাচ্ছে। প্রথম দশ দিন ছিল রহমত এবং পরের দশ দিন অর্থাৎ ২০ রমজান মাগফেরাত চলে যাচ্ছে। মহান রাব্বুল আলামিন ধৈর্য, সহানুভূতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এই মাসকে এত উন্নততর মর্যাদা দিয়েছেন যে, কেউ এক রাকাত নফল নামাজ পড়লে অন্য মাসের তুলনায় ৭০ রাকাত ফরজ নামাজের পুণ্যদান করবেন। অনুরূপভাবে যে ১ টাকা দান করলো অন্যান্য মাসের ৭০ টাকার সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হবে।
যে কথা বলছিলাম, রমজান মাস তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম দশদিন রহমত। মাঝের দশ দিন মাগফেরাত এবং শেষের ১০ দিন নাজাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশ্বের মুসলিম উম্মার জন্য এই মাসে সিয়াম সাধনা বা রোজা রাখাকে আবশ্যিক বা কম্পলসারি করা হয়েছে। আমাদের পূর্বে ও পৃথিবীতে যারা ছিলেন তাদের প্রতিও রোজা ফরজ করা হয়। রমজান মাসের তাৎপর্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই মাসে অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে পবিত্র কুরআন মজিদ এ মাসেই লহু মাহফুজ থেকে পৃথিবী বক্ষে জিব্রাইল আলাহিস সালাম এর মাধ্যমে মহানবী (সাঃ) এর কাছে নাজিল হয়েছিল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এভাবে পৃথিবীতে কুরআন নাজিল করেন।
সিয়াম সাধনার এই মাসে রোজার মাধ্যমে রাব্বুল আলামিন বান্দার শরীরকে উপবাসের মাধ্যমে কঠোরভাবে প্রজ¦লিত করে বিশুদ্ধ করেন। একজন প্রকৃত মুসলমান সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ক্ষুধার যন্ত্রণা, অভাবী মানুষের কষ্ট সম্পর্কে এবং বিপন্ন মানুষের সহযোগিতা করার কঠিন শিক্ষা গ্রহণ করে। সিয়াম সাধনার এই মাসে আমাদের কর্তব্যনিষ্ঠা, ধৈর্য ও ঈমানের পরীক্ষা নেন স্বয়ং রাব্বুল আলামীন। শুধু ভোর রাত্রি থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অর্থাৎ সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনাহার উপবাসের কথাই শুধু বলা হয় নাই, এই মাস আত্ম আত্মসংযমের মাস এই মাসে সকল প্রকার অবাঞ্ছিত ভাবনা, কথাবার্তা থেকে বিরত থাকার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই মাসের শেষ পর্যায়ে শাওয়ালের চাঁদ উঠলে যদিও ঈদের খুশি কিন্তু এর পূর্বে অনেকগুলো দায়-দায়িত্বের কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। এই মাসে প্রতিবেশীদের প্রতি, মুসাফিরদের প্রতি, অভুক্তদের প্রতি, এতিমদের প্রতি, দরিদ্র-নিকট আত্মীয়দের প্রতি, বিত্তবানদের দায়িত্ব কর্তব্যের কথা এবং তাদেরকে আন্তরিকভাবে সব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ মাসে আমাদের ব্যাবসা-বাণিজ্যে অধিক মুনাফা অর্জনের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। আমাদের জীবন আচরণ, আমাদের জীবনের অতীতের ভুল ত্রুটি মোচনের জন্য রাব্বুল আলামীনের কাছে বেশি বেশি ফরিয়াদের কথা বলা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি, এ মাসে রাত জেগে তারাবি নামাজ আদায়, বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া, জীবনের কাজা নামাজ গুলো আদায়ের বিষয়ে সকল মুসলমানের দৃষ্টি রাখা উচিত। যেহেতু বেশি সওয়াবের অতিরিক্ত পুণ্যের মাস রমজান। কিন্তু এই মাসে আমরা কী দেখি! রমজান আসার শব্দ শুনলে ব্যবসায়ীরা, মজুতদাররা, মুনাফা লোভীরা বেশি মাত্রায় তৎপর হয়ে ওঠে। তারা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে বেশি মুনাফা লুটার জন্য তৎপর হয়। এদের সম্পর্কে কুরআন হাদিসে কঠিন শাস্তির উল্লেখও আছে। কেউ যেন তা স্মরণই করছে না! কারণ আমাদের দেশে জবাবদিহিতার বড্ড অভাব!
আমাদের দেশে এক শ্রেণীর লোক আছেন সুস্থ শরীরে তারা রমজানের দিনগুলো দিব্যি খেয়ে আনন্দ করে দিনযাপন করে, যা অত্যন্ত গর্হিত ব্যাপার। শাওয়াল মাসের প্রথম দিন ঈদের জামাতে বয়ান করা হয়, ঈদ তাদের জন্য যারা ৩০ দিন কষ্ট করে রোজা রেখেছেন, সেহরি খেয়েছেন, অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সংযমের সাথে আল্লাহর বিধি-বিধান পালন করেছেন, রাত জেগে তারাবি নামাজ আদায় করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্পষ্ট উল্লেখ করেন তাদের জন্য ঈদ না, যারা পুরো মাস আমার নির্দেশ অমান্য করে, আমার নির্দেশের বিরুদ্ধে নাফরমানি করলো। সুতরাং সে বিষয়ে আমাদের বিশেষভাবে সতর্ক হওয়া দরকার।
বিবেকের কাছে যদি আমরা প্রশ্ন করি, রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালন করার ব্যাপারে আমরা কতটুকু পারঙ্গম? কী স্পষ্ট জবাব আসবে। নিজের কাছে নিজেরাই জিজ্ঞাসা করে দেখি।
রমজান যেমন একটা মানুষকে অনাহারের মধ্য এক মাসে জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে খাঁটি মানুষে পরিণত করে, আমরা একটা শৃঙ্খলার মধ্যে জীবনকে গড়ে তুলি, আমাদের উচিত পরের ১১ টি মাস এভাবে জীবনকে পরিচালিত করা।
রমজানের বিধি-বিধান মেনে চলার ব্যাপারে বিশেষভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যারা বৃদ্ধ অক্ষম অসুস্থ তাদের জন্য একজন দুস্থ রোজাদারকে খাবার দিয়ে দায়িত্ব পালন করাতে হবে। যদি কোনো কারণে সুস্থ অবস্থায় রোজা ভঙ্গ করা হয় কফ্ফারা হিসেবে ষাটটি রোজা রেখে দিতে হবে। সুতরাং এ মাসে সকল ধর্ম প্রাণ মুসলমানদের উচিত সিয়াম সাধনায় বিশেষভাবে ব্রতী হওয়া।
এ মাসের আলোকে অন্যদিকে চোখ ফেরাই। গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি সাবান মাস শেষ হয়েছে পরের দিন শুরু হয়েছে রমজান। উনিশে ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার। ঐদিন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে দেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান জরুরিভাবে মিটিংয়ে বলেছেন, সেহরি, ইফতার ও তারাবির সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ রাখতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক সত্য কথা, এ মাসেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করে গত ১৭ রমজান সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের সময় খুলনার ডুমুরিয়া অঞ্চলে পাঁচ মিনিট বিদ্যুৎ বন্ধ করে রাখা হলো। এদের বুকের পাটার তারিফ করতে হয়। রমজানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্যও স্বাভাবিক রাখা, প্লাস সেহরি, ইফতার, তারাবির সময়টা যেন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক থাকে এবং নির্বাচন প্রাক্কালে সরকারের যে কমিটমেন্ট তা অক্ষরে অক্ষরে পালনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর বলেছিলেন, রমজানে যেন স্বস্তিদায়ক পরিবেশ বজায় থাকে, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সদা তৎপর থাকতে হবে। কিন্তু হচ্ছেটা কী? রমজান শুরু হওয়ার দু-দিন আগেই ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার থেকে রমজানের বাজার সিন্ডিকেটের দখলে চলে যায়। খেজুরসহ ইফতারি সেহরির নিত্য পণ্যের দাম রকেট গতিতে বৃদ্ধি পায়। সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নির্দেশ লঙ্ঘন করে একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ ইতর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী এইসব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই মাসে স্বস্তিতে রোজা রাখার জন্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের ভাবনা ও নির্দেশনা থাকলেও স্বেচ্ছাচারী ব্যবসায়ীরা খেজুরসহ প্রতিটি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বৃদ্ধি করেছে।
সাধারণ ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন, সিন্ডিকেট করে পণ্যগুলোর দাম বাড়িয়েছেন বড় বাজারের ব্যবসায়ীরা। এদিকে খুলনার গ্রাম অঞ্চলে ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, রুপসা, তেরখাদা এলাকার চিত্র একই রকম। এদিকে ক্ষীরা, গাজর, ছোলা, চিনি, শরবত তৈরির প্রোডাক্ট গুলোর দামও শা শা করে বাড়ানো হয়েছে। কাঁচা মরিচের দামও বাড়ানো হয়েছে। খেজুরের দাম বৃদ্ধি সম্পর্কে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা খুচরো বিক্রেতাদের কাছে সংকট সৃষ্টি করে বেচাকেনা করছে। এক খেজুরের দামের ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি একশ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। রমজানের শুরুতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে উচিত জরুরিভাবে আকস্মিকভাবে গুদাম গুলোতে হানা হানা দিয়ে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। ইতোমধ্যে বাজারে গরম মশলা সহ রসুনের দামও বৃদ্ধি করা হয়েছে একই প্রক্রিয়ায়।
আমরা মনে করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের অন্ততপক্ষে এই মাসে রোজাদারদের হয়রানি মুক্ত জীবন যাপনের জন্য একটু তদারকি করা দরকার।
অন্যদিকে একটু চোখ ফেরাই। আমাদের সমাজের বিত্তবান মানুষেরা লোক দেখানো দানের জন্য অনেক সময় শাড়ি লুঙ্গি নগদ অর্থ জাকাত হিসেবে বিতরণ করতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে চাপা চাপিতে অনেকে প্রাণ হারান। এই ধরনের ট্রেডিশন অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। গরিবের পাওনা হক অবশ্যই সকল বিত্তবান মুসলমানের উচিত ঈদের ময়দানে যাওয়ার আগে মিটিয়ে দেওয়া। হোলি কুরআনে এ সংক্রান্ত স্পষ্ট কঠোর নির্দেশনায় রয়েছে। আমরা যেন জাকাত ফিতরা দেওয়ার সময় উদার মনে, মুক্ত হস্তে দান করি। অনেক সময় দাতা- গ্রহীতার মধ্যে মন কষাকষির চিত্র লক্ষ্য করা যায়। এসব বিষয় অবশ্যই আমাদের বর্জন করতে হবে। এ বছর স্থান ভেদে যেখানে যেরকম ফেতরা নির্ধারণ করা হয়েছে, ফেতরার টাকা অবশ্যই ঈদগাহে যাওয়ার আগে পরিশোধ করা উচিত।
পরিশেষে একটি কথা বলবো, আমাদের জীবনে ঈদ তখনই সফল হয়ে উঠবে, যখন আমরা সবার সাথে ভাগাভাগি করে ঈদ উৎসবকে পালন করতে পারব। অন্তত বছরের একটা দিন ঘরে ঘরে আনন্দে বার্তা পৌঁছাতে হলে ধনী নির্ধন সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই গলায় গলায় সাম্য মৈত্রী বন্ধনে আসুন আমরা আবদ্ধ হই। এইজন্য বোধ হয় কবি বলেছেন, হাররোজ যারা ক্ষুধায় কাতর, আসে না যাদের নিন্দ্, সেই হতভাগাদের জীবনে বুঝি আজকে এসেছে ঈদ!
আমরা অবশ্যই পাপ মোচন এর এবং পুণ্য সঞ্চয়ের এই মাসে আসুন রমজানের যথার্থতা উপলব্ধি করে সামনের দিনগুলো অতিবাহিত করি। এ মাসে ২০ তারিখের পর থেকে বিজোড় দিনগুলোতে শবে কদরের রাতের অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। যেমন : ২১, ২৩,২৫, ২৭ ও ২৯ এই রজনীগুলোতে অবশ্যই আমরা শবে কদরকে অনুসন্ধান করব। এই পুণ্য রাতে সফলভাবে নফল নামাজ আদায় করতে পারলে যথেষ্ট সওয়াব আছে। লাইলাতুল কদরের এক রাতেই ৮০ বছরের ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। আসুন আমাদের ক্ষুদ্র জীবনে, ক্ষণস্থায়ী জীবনে শবে কদর রাতকে অনুসন্ধান করি। ইতোমধ্যে আমরা রহমত পার হয়ে আগামীকাল মাগফেরাত পার হবো; তারপর নাজাতের ১০ দিন। এই রমজান মাসে যে বে খবর ব্যক্তি নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না, তার চেয়ে হতভাগা আর কেউ নেই, এ ধরনের নির্দেশ হাদিসে রয়েছে। আসুন আমরা রমজানের তাৎপর্য উপলব্ধি করে জীবনকে, আগামী দিনকে রাব্বুল আলামিনের নির্দেশিত পথে পরিচালিত করার শপথ নেই, দীক্ষা গ্রহণ করি। আমিন সুম্মা আমিন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
খুলনা গেজেট/এএজে

